~ তুমি চলে এসো এক বরষায়...~
তিয়াশার আজ ক্লাসে যেতে একদমই ইচ্ছে করছে না। সকাল আটটায় একটা ক্লাস। মাঝে কোন ক্লাস নেই। সেই একেবারে দু’টোর সময় আছে আরেকটা।
ধুর! না গেলাম আজ ক্লাস করতে। কী সুন্দর বৃষ্টি বৃষ্টি সকাল! -- এই ভেবে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল তিয়াশা।
সকাল সাতটায় অ্যালার্ম বেজে উঠল। ঘড়িতে নয়। মোবাইলে। বন্ধ করে আবার ঘুমিয়ে পড়বে ভেবে মোবাইল হাতে নিল তিয়াশা।
একী! তেত্রিশটা মিসড কল আর দু’টো এসএমএস!
বিদ্যুত গতিতে উঠে বসল তিয়াশা। অর্নব এতবার ফোন করেছে কেন! মোবাইল সাইলেন্ট করা ছিল। একদমই টের পায়নি। সাথে সাথে কল ব্যাক করল তিয়াশা--
‘দুঃখিত এই মুহূর্তে মোবাইল সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছেনা। অনুগ্রহ করে..........’
পর পর দশবার কল দিয়ে একই কথা শুনল।
কী হয়েছে অর্নবের! এসএমএস দু’টো পড়তে লাগল তিয়াশা--
‘Phone receive korona keno? It’s urgent!’
পরেরটায় লেখা-
‘sokal 10tay TSC-te theko plz’
তিয়াশার প্রচন্ড ভয় করতে লাগল। ফোন বন্ধ করে রেখেছে কেন অর্নব! কোন দুর্ঘটনা নয় তো!
সকাল আটটার ক্লাসে মন বসাতে পারল না তিয়াশা। মাঝখানে আরও দুই বার চেষ্টা করেও অর্নবকে ফোনে পায়নি। সাড়ে নয়টার দিকে টিএসসির দিকে হাঁটা ধরল সে। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে হাঁটতে থাকে তিয়াশা। ওর মনে হয়, আর কখনও বুঝি অর্নবের সাথে দেখা হবেনা!
প্রায় আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও অর্নবের দেখা পেলনা তিয়াশা। আরেকবার ফোন করল অর্নবকে।
রিং হচ্ছে এইবার!—
‘হ্যালো তিয়াশা...এসেছ তুমি?’
‘তুমি... তুমি কোথায় এখন? ফোন অফ ছিল কেন? সকালে এতবার ফোন করেছ যে! কী হয়েছে তোমার? প্লিজ বল আমাকে......’
‘আচ্ছা আচ্ছা, এত প্রশ্ন একসাথে জিজ্ঞেস করলে হবে? আমি এসে গেছি প্রায়। এসে বলছি তোমাকে সব।’
ঐ তো অর্নব! আসছে ও। কিন্তু ওকে এমন দেখাচ্ছে কেন! এত গম্ভীর! এমন চেহারায় তো কখনও দেখেনি ওকে তিয়াশা।
প্রায় বছর খানেক হতে চলেছে দু’জন দু’জনকে চেনে ওরা। ভালোবাসে। পরস্পরকে বোঝার চেষ্টা করে। ওদের মধ্যকার সম্পর্কটা চমৎকার! অর্নবের সবচেয়ে ভালো দিক হলো, ও কখনও রাগ করতে পারেনা। গম্ভীর হয়ে বা মন খারাপ করেও থাকতে দেখা যায়না ওকে খুব একটা। সবসময় মুখে এক টুকরো হাসি লেগেই থাকে। আর ওর এই হাসিমুখ দেখলে তিয়াশার ভেতরে সবকিছু ওলটপালট হয়ে যেতে থাকে। গলা শুকিয়ে যায়, হাত-পা কাঁপতে থাকে!
এসব অনুভূতি ছিল সুন্দরকে ভালোবাসার। পাশে পাওয়ার। আনন্দের।
কিন্তু আজ অর্নবের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়েও তিয়াশার গলা শুকিয়ে আসছে। হাত-পা কাঁপছে। এই অনুভূতি তো কোন আনন্দের অনুভূতি নয়। বরং মনে হচ্ছে ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
‘তিয়াশা, তোমাকে এভাবে ডেকেছি খুব প্রয়োজনীয় কিছু কথা বলব বলে।’
‘কিন্তু অর্নব তুমি...তোমাকে এমন...’
‘অস্থির হবেনা। আমি বলছি সব। তুমি একটু ধৈর্য ধরে আমার কথাগুলো শুনবে। আমার কথা শেষ হওয়ার আগে কোন কথা বলবেনা প্লিজ।’
‘আচ্ছা, তুমি বল’ -- কোন রকমে বলল তিয়াশা।
‘আসলে আমি খুব সমস্যার মধ্যে আছি। আর তোমাকে আমার জীবনের এসব সমস্যায় আমি জড়াতে চাইনা। তুমি আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দর আর সবচেয়ে ভালো মেয়ে। কিন্তু আমি তোমাকে পাওয়ার ভাগ্য নিয়ে জন্মাইনি। তাই আমাদের সম্পর্কের এখানেই ইতি টানতে হচ্ছে। আমাকে মাফ করে দিও তুমি।’
‘কি...কিন্তু...’
‘বলছি আমি। আমাকে আজ রাতের ট্রেনেই চট্টগ্রাম চলে যেতে হচ্ছে। মা ডেকে পাঠিয়েছে। খুব নাকি জরুরী। আমি কয়েকদিন পর ঢাকায় ফিরব। ফিরেই তোমাকে সবকিছু খুলে বলব। তখন হয়তো তুমি আমাকে মাফ করে দিতে পারবে।’
‘অর্নব...অর্নব তুমি ...তুমি ফান করছ তাইনা?’-- তিয়াশার চোখে অবিশ্বাস!
‘আমি কোন ফান করছিনা তিয়াশা। আর এখন আমাকে যেতে হবে। অনেক কাজ আছে যেগুলো বাড়িতে যাওয়ার আগেই সেরে ফেলতে হবে।’-- বলেই আর দাঁড়াল না অর্নব। পেছনে ফিরে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা তিয়াশাকেও দেখল না একবার।
কীভাবে যে তিয়াশা বাসায় ফিরেছে ও নিজেও জানেনা। উদ্ভ্রান্তের মতো দৃষ্টি নিয়ে টলতে টলতে কোন রকমে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল সে।
‘কীরে কী হয়েছে তোর? কী হয়েছে বল মা। খারাপ লাগছে?’-- মা এসে আগলে ধরেন তিয়াশাকে।
‘মা, আমার খুব......’ -- এইটুকু বলে মায়ের কোলে ঢলে পড়ল তিয়াশা।
জ্ঞান ফিরলে নিজেকে ওর ঘরে আবিষ্কার করল তিয়াশা। পাশে উদ্বিগ্ন মুখে মা বসে আছেন।
‘মা, আমি খুব ...আসলে...’
‘এখন কিছু বলতে হবে না মা। ডাক্তার বলে গেছে তোকে রেস্ট নিতে। কোন স্ট্রেস নিস না। একটু কিছু খেয়ে ঘুমানোর চেষ্টা কর।’
‘মা, বাবাকে কিছু বোলনা প্লিজ।’
‘আমাকে বলতে হবে কেন? তোকে দেখলেই তো তোর বাবা বুঝে যাবে যে তার কন্যা ঠিক নেই।’ মা নিজের হাতে ওকে খাইয়ে দিলেন। তারপর ঔষধ খাইয়ে দিয়ে ঘুমাতে বলে গেলেন তিয়াশাকে।
মা চলে গেলে দুর্বল পায়ে উঠে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াল তিয়াশা। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি। একটা বুলবুলি পাখি বৃষ্টির পানিতে ভিজছে। একা। খুব অসহায় দেখতে লাগছে পাখিটাকে। তিয়াশা ভাবে, বুলবুলির সঙ্গীটা গেল কোথায়! ছোট্ট পাখিটার জন্য কষ্ট হতে থাকে ওর। পাখিটার মধ্যে নিজের ছায়া কী দেখতে পেল সে? একাকীত্বের ছায়া!
বৃষ্টি খুব প্রিয় তিয়াশার। অর্নবকে নিয়ে হাত ধরাধরি করে তুমুল বর্ষা মাথায় করে পথ হাঁটার ইচ্ছে ওর কতদিনের! আর কোনদিন পূরণ হবেনা সে ইচ্ছে। হঠাৎ করেই বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাও যেন চলে যেতে থাকে তিয়াশার। ঠিকমত শ্বাস নিতে পারেনা ও। অবশেষে শ্রাবণধারার জোয়ার এল ওর দু’চোখ বেয়ে। এই প্রথম ও কাঁদতে পারল।
সারাদিন আর কিছু খেতে পারলনা তিয়াশা। ঘুমাতেও পারলনা ঠিকমত। একটা আধো ঘুম আধো জাগরণের দুঃস্বপ্নময় জগতে আটকে রইল। মাঝখানে একবার বাবা-মা এসে দেখে গেছেন যে ও ঘুমুচ্ছে। আসলে কী ঘুমাতে পেরেছিল তিয়াশা?
না, ঘুমাতে পারেনি। অনেকবার অর্নবের বন্ধ করে রাখা ফোনে ফোন করেছে তিয়াশা। বার বার আশাহত হয়েছে আর গলার মাঝে দলা পাকিয়ে আটকে থাকা কান্নাগুলোকে ঝরিয়েছে, কখনও নীরবে, কখনওবা সশব্দে।
এত কষ্ট কেন দিল তাকে অর্নব! তাহলে কী কখনই তিয়াশাকে ভালোবাসেনি সে! সব অভিনয় ছিল? সব মিথ্যে? এত মধুর স্মৃতি দু’জনের, কিভাবে ভুলে যাবে তিয়াশা!
এতকিছুর পরও অর্নবের উপর রাগ হয়না ওর। হয়ত ভালোবাসার মানুষের উপর কখনই রাগ করা যায়না। শুধু অভিমান করা যায়। আর ভালোবাসার মানুষটি সামনে এসে ভালোবাসাময় হাসিমুখটি দেখালেই এ অভিমান কর্পুরের মত কোথায় উড়ে যায়!
‘অর্নব, তুমি ফিরে এস।’ -- প্রার্থনামগ্ন তিয়াশা।
‘তিয়াশা মা, আসব?’-- বাবার কণ্ঠ। এত রাতে!
‘এসো বাবা।’
‘আমি খোঁজ নিয়েই এসেছি যে তুমি জেগে আছ’-- বাবা ভেতরে এলে তিয়াশা দেখল বাবার হাতে একটি বিশাল কেক।
‘Happy Birthday to my Princess! My little Princess is now a beautiful young lady of 23’
‘Happy Birthday মা, এখন একটু ভালো লাগছে তোর?’-- বাবার পেছনে মা’ও এসেছেন। তার হাতে প্রতিবারের মতো একটা সারপ্রাইজ গিফট।
‘এখন কেক কাটা হবে। ঝটপট তেইশটা মোমবাতি জ্বালিয়ে ফেলি।’-- বাবা বললেন।
তিয়াশা দেখল রাত বারোটা বেজে দুই মিনিট।
কেক কাটা হলে, সারপ্রাইজ গিফটটা তিয়াশার ঘরে রেখে বাবা-মা চলে গেলেন।
এখন একটু ভালো লাগছে তিয়াশার।
বাবা-মা ছিলেন বলেই আজও পৃথিবীটাকে সুন্দর মনে হয়। জন্মের পর থেকেই পরম যত্নে সব প্রতিকূল পরিবেশ থেকে ওকে আগলে রেখেছেন এই দুইজন মানুষ। এখনও তারা তাদের সাধ্যমত চেষ্টা করে চলেছেন তাদের সন্তানকে ভালো রাখার। বাবা-মা’র প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে ওঠে তিয়াশার।
জন্মদিনে প্রতিবার রাত বারোটার পর কেক কাটা আর একটা সারপ্রাইজ গিফটের জন্য কি অপেক্ষাই না করে তিয়াশা। আর এইবার মনেই ছিলনা জন্মদিনের কথা। সারপ্রাইজ পেতে খুব ভালো লাগে ওর। তাই প্রতিবারই বাবা-মা ওকে একটা দারুণ কিছু উপহার দেন। অন্য সময় হলে বাবা-মা চলে যাওয়ার সাথে সাথেই গিফটটা খুলতে শুরু করত তিয়াশা। কিন্তু এইবার ওটা পড়ে রইল একই জায়গায়। নিঃসন্দেহে এটা ওর জীবনের সবচেয়ে জঘন্য জন্মদিন।
‘আমার মাঝে মাঝেই মনে হত, আমার জন্মদিনই হবে আমার মৃত্যুদিন। তুমি কী আমার এই ধারণাকেই সত্যি করতে চেয়েছ অর্নব!’-- ভাবনার জগতে হারিয়ে যায় তিয়াশা।
ঘুম এসেছিল তাহলে। খুব সকালে ঘুম ভাঙল তিয়াশার। উঠেই জানালার পাশে চলে গেল বিষাদময় সকালটাকে দেখতে। মেঘলা আকাশ। তবে বৃষ্টি নেই। দু’টো বুলবুলি কিচিরমিচির করছে! আরে বুলবুলিটা ওর সঙ্গীকে খুঁজে পেয়েছে তাহলে!
আচ্ছা, অর্নবকে একটা ফোন করবে নাকি, ভাবল তিয়াশা। হয়ত আজ ওর জন্মদিন বলে একটু ভালো ব্যবহার করবে ওর সাথে। আর তাছাড়া ঠিকমতো বাড়িতে পৌঁছাল কিনা তাও তো জানা হয়নি তিয়াশার। হ্যাঁ, একটা ফোন করেই দেখা যাক।
‘দুঃখিত এই মুহূর্তে.........’-- ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় তিয়াশার। মোবাইলটাকে অফ করে একপাশে ছুঁড়ে ফেলে ও। চিৎকার করে কাঁদে তিয়াশা।
সকাল সাতটায় মা এলেন ব্রেকফাস্ট নিয়ে। বাবাও মাঝে একবার এসে দেখা করে গেছেন তিয়াশার সাথে ।
‘বাইরে কোথাও প্রোগ্রাম নেই আজ তোর? বন্ধুদের সাথে?’ -- মা জিজ্ঞাসা করেন।
‘না মা, কোন প্ল্যান করা হয়নি। আর তাছাড়া আমার ভালোও লাগছেনা।’
‘ভালো লাগছেনা বললে হবে? বাইরে কোথাও থেকে ঘুরে এলে, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিলে তো ভালোই লাগার কথা তোর।’
‘মা একটা রিকোয়েস্ট রাখবে আমার?’
‘কী রিকোয়েস্ট বল, রাখব।’
‘আজ বাসায় কোন গেস্ট ইনভাইট করবে না প্লিজ। আমার একদম ভালো লাগছেনা।’
‘আচ্ছা। কথা যখন দিয়েছি, তা তো রাখতেই হবে।’
‘থ্যাংকিউ মা!’
‘কিন্তু বাইরে কোথাও তোর প্রোগ্রাম না থাকলে বলিস আমাকে। আমরা তিনজনেই না হয় কোথাও থেকে ঘুরে অথবা বাইরে কোথাও থেকে খেয়ে আসব।’
‘আচ্ছা মা, বলব তোমাকে।’
‘তিয়াশা-আম্মা ! তুমার মোবাইল নাকি বন্ধ, তাই তুমার বান্ধবী জুলেখা তুমারে বাসার ফুনে ফুন দিসে। লাইনে আছে।’ -- এই হলো ফুলি খালা। তিয়াশাদের বাসায় আছে অনেকদিন। বাসার সব কাজ পারলে ফুলি খালাই করে। ছোটোবেলা থেকেই দেখে আসছে তিয়াশা।
‘আমার তো জুলেখা নামে কোন বন্ধু নেই ফুলি খালা। নিশ্চয়ই রং নাম্বার হবে।’
‘না গো আম্মা। আমার কথা বিশ্বাস যাও। তুমারেই খোঁজতেছে।’
‘হ্যালো তিয়াশা!! হ্যাপ্পি বার্থডে টু ইউ!! তোর মোবাইল অফ কেন? কী হইছে তোর?’
‘হ্যালো, কে রে তুই?’
‘বলিস কি! আমাকে চিনতে পারতেছিস না! তোর তো আসলেই মাথা গেছে! ফুলি খালা আমার নাম বলে নাই তোকে? আমি জুলিয়া!’
‘ওহ তাই বল। থ্যাংকিউ দোস্ত। ফুলি খালা বলছিল যে কোন জুলেখা নাকি ফোন করেছে, তাই চিনতে পারি নাই তোরে।’
‘হিহিহি জুলেখা...ফুলি খালা... হিহি...জুলিয়া থেকে জুলেখা বানায় দিল! আচ্ছা তোর কি হইছে বল!’
‘আমার কিছু হয় নাই রে। এই এমনি একটু মাইগ্রেন...’
‘আরে এসব বাদ দে এখন। বাইরে আয়। আমরা সবাই আছি। বিশাল আড্ডা দিব। অনেক মজা করব। তোর মাথাব্যথা সব পালাবে।’
‘শোন আমি আসলে...’
‘কোন শোনাশুনি নাই। আগে আয় তারপর বলবি। সবাইরে বলছি সকাল দশটার সময় ন্যাশনাল মিউজিয়ামের গেটে থাকতে। ঐখানে সবাই মিট করে ঠিক করব কোথায় কোথায় আমরা যাব আজকে।
ক্লিয়ার? সুতরাং সকাল দশটায় উপস্থিত হবি। টাটা ।’
তিয়াশা একবার ভাবল যে যাবে না বাইরে। আবার ওর মনে হল, যদি বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে কিছুক্ষণ কষ্ট ভুলে থাকা যায় তো মন্দ কী! তাই সকাল পৌনে দশটায় বাসা থেকে বের হল তিয়াশা।
এলিফ্যান্ট রোড থেকে শাহবাগ দূরে নয়, ওর মনে হল ও পৌঁছে যাবে সবার আগে। আর দাঁড়িয়ে থাকবে একা একা, যে কাজটা ওর সবচেয়ে অসহ্য!
হলোও তাই। কেউ আসেনি এখনও। জুলিয়াকে কল দিল তিয়াশা। রিং হচ্ছে। কিন্তু রিসিভ করছেনা কেউ। এই এক সমস্যা! কাজের সময় কেউ ফোন রিসিভ করেনা। কে কে আসবে তাও জুলিয়ার কাছ থেকে জেনে নেওয়া হয়নি। তাহলে ওদেরকে ফোন দেওয়া যেত।
আকাশে মেঘ করেছে ভালোই। বৃষ্টি নামবে নাকি! একা একা এরকম জায়গায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভেজার কোনই ইচ্ছে নেই তিয়াশার। জুলিয়াকে আবার ফোন করল সে।
-- ‘হ্যালো তিয়াশা। আমাদের আর দশ মিনিট লাগবে দোস্ত। জ্যামে পড়ছিলাম রে! তুই এক কাজ কর বুঝলি, মিউজিয়ামের অপজিটে যে ফুলের দোকানটা থেকে আমরা ফুল কিনি ঐ দোকানে একটু যা। আমি গতকাল কিছু নীল অর্কিডের অর্ডার দিসিলাম। আজকেই লাগবে। এনেছে কিনা দেখ তো। একা একা দাঁড়ায় না থেকে এইটা কর। ততক্ষণে আমরা চলে আসব। টাটা।’
এতক্ষণ একা দাঁড়িয়ে না থেকে ফুলের দোকানগুলোতে ঢুঁ মারলেই কাজ হত, ভাবল তিয়াশা। অজস্র ফুল, অনেক রং, ফুলের সুঘ্রাণ সব মিলিয়ে একটা পবিত্র অনুভূতি কাজ করে!
কিন্তু নির্দিষ্ট দোকানে গিয়ে দাঁড়াতেই মন আরও খারাপ হয়ে গেল তিয়াশার। অনেকগুলো বিশাল বিশাল লাল গোলাপ! কী সুন্দর রং! কী সুঘ্রাণ! কী পবিত্র! তিয়াশার খুব প্রিয় এই ফুল।
অর্নবকে একদিন হাসতে হাসতে বলেছিল সে, ‘ইস! আমার জন্মদিনে কেউ যদি আমাকে এক ট্রাক লাল গোলাপ দিত! তাহলে তাকেও আমি তার খুব প্রিয় কিছু একটা উপহার দিতাম!’
‘এক ট্রাক না হলেও অনেকগুলো দিতে পারি। চলবে না?’
‘অনেকগুলো! কতগুলো?’
‘এই ধর তোমার যত তম জন্মদিন হবে ততগুলো। তাহলে বয়সটাও গোপন করতে পারবে না! এক ঢিলে দুই আম!’
‘এক ঢিলে দুই আম আবার কী জিনিস!’
‘বুঝলে না? ঢিল দিয়ে নিরীহ পাখিকে মারার কি দরকার? তারচেয়ে আম পাড়লে লাভ আছে।’
‘ধুর! এইটা কিছু হইল? বোরিং জোক! হিহিহি! আচ্ছা তারপর তোমাকে আমি তোমার কোন প্রিয় জিনিসটা দিতে পারি?’
‘সারাজীবন ভালোবেসে যেতে পার। এর চেয়ে সেরা কিছু এই মুহূর্তে মনে আসছেনা!’
‘আপু, কিছু লাগবে?’-- দোকানদারের কথায় ভাবনার জগত থেকে বেরিয়ে আসে তিয়াশা। ওর চোখের কোণে চিকচিক করা পানি শুকায়নি তখনও।
‘হ্যাঁ ইয়ে কতগুলো নীল অর্কিডের অর্ডার দেওয়া ছিল। আজকেই নেওয়ার কথা। এনেছেন ওগুলো?’
‘নীল অর্কিড! নীল অর্কিডের অর্ডার কে দিল? আমি তো দিয়েছিলাম তেইশটা স্পেশাল লাল গোলাপের অর্ডার।’
তিয়াশা কিছুক্ষণের জন্য বধির হয়ে গেল। কোন শব্দ শুনছেনা । শুধু একটু আগে শোনা কণ্ঠস্বরটা কানে বেজে চলেছে।
অর্নব! অর্নব এসেছে!
পেছনে ফিরতে সাহস হয়না তিয়াশার। হয়তো ভুল শুনেছে । হয়তো অন্য কেউ। নিজের অজান্তেই চোখ বন্ধ করে ফেলে তিয়াশা!
‘এই গোলাপগুলোকে তো তোমার পাশে ম্লান লাগছে। চোখ বন্ধ অবস্থায় নিজের ছবি কল্পনা করে নাও তারপর চোখ খুলে এগুলোর দিকে তাকাও। নিজেই প্রমাণ পাবে!’
চোখ খুলে গোলাপ নয় তিয়াশা দেখতে পেল সেই চেনা ভালোবাসাময় হাসিমাখা মুখ! অভিমান হয়ে যাচ্ছে কর্পুর!
‘তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার ভাষা আমার নেই। তবুও বলি, আমাকে মাফ করে দাও প্লিজ। আমি জানি তুমি সারপ্রাইজড হতে ভালোবাসো। তাই চেয়েছিলাম তোমাকে চমকে দিতে। কিন্তু তুমি আমাকেই চমকে দিয়েছ! এই কয়টা গোলাপের বিনিময়ে এত ভালোবাসা তো চাইনি আমি!’
তিয়াশা কিছুই বলতে পারেনা। এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে অর্নবের দিকে। ওর চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু যে কোন সময় বিন্দু হয়ে গড়িয়ে যাবে।
অর্নব বলে চলেছে --
‘আমি কিন্তু তোমার খোঁজ নিয়েছি নিয়মিত। তোমার অবস্থার আপডেট আমাকে জানিয়ে হেল্প করার জন্য স্পেশাল থ্যাংকস টু জুলিয়া এবং ফুলি খালা! কিন্তু বিশ্বাস কর, তোমার চেয়ে কষ্ট আমি কিছু কম পাইনি।
ভালোবাসার মানুষকে কষ্ট দিলে সেই কষ্ট হাজার গুণ হয়ে ফিরে আসে, এটা আমি বুঝেছি।’
অর্নব পরম ভালোবাসায় তিয়াশার কাঁপতে থাকা হাতটা ধরল।
ঠিক এই সময় আকাশ ভেঙে নামল বৃষ্টি।
ভালোবাসাময় এই করুণাধারায় সিক্ত হচ্ছে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন মানব-মানবী। আর তেইশটি লাল গোলাপ।
দূর থেকে দৃশ্যটিকে অতিপ্রাকৃত কোন দৃশ্য বলে মনে হচ্ছে!
ধুর! না গেলাম আজ ক্লাস করতে। কী সুন্দর বৃষ্টি বৃষ্টি সকাল! -- এই ভেবে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল তিয়াশা।
সকাল সাতটায় অ্যালার্ম বেজে উঠল। ঘড়িতে নয়। মোবাইলে। বন্ধ করে আবার ঘুমিয়ে পড়বে ভেবে মোবাইল হাতে নিল তিয়াশা।
একী! তেত্রিশটা মিসড কল আর দু’টো এসএমএস!
বিদ্যুত গতিতে উঠে বসল তিয়াশা। অর্নব এতবার ফোন করেছে কেন! মোবাইল সাইলেন্ট করা ছিল। একদমই টের পায়নি। সাথে সাথে কল ব্যাক করল তিয়াশা--
‘দুঃখিত এই মুহূর্তে মোবাইল সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছেনা। অনুগ্রহ করে..........’
পর পর দশবার কল দিয়ে একই কথা শুনল।
কী হয়েছে অর্নবের! এসএমএস দু’টো পড়তে লাগল তিয়াশা--
‘Phone receive korona keno? It’s urgent!’
পরেরটায় লেখা-
‘sokal 10tay TSC-te theko plz’
তিয়াশার প্রচন্ড ভয় করতে লাগল। ফোন বন্ধ করে রেখেছে কেন অর্নব! কোন দুর্ঘটনা নয় তো!
সকাল আটটার ক্লাসে মন বসাতে পারল না তিয়াশা। মাঝখানে আরও দুই বার চেষ্টা করেও অর্নবকে ফোনে পায়নি। সাড়ে নয়টার দিকে টিএসসির দিকে হাঁটা ধরল সে। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে হাঁটতে থাকে তিয়াশা। ওর মনে হয়, আর কখনও বুঝি অর্নবের সাথে দেখা হবেনা!
প্রায় আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও অর্নবের দেখা পেলনা তিয়াশা। আরেকবার ফোন করল অর্নবকে।
রিং হচ্ছে এইবার!—
‘হ্যালো তিয়াশা...এসেছ তুমি?’
‘তুমি... তুমি কোথায় এখন? ফোন অফ ছিল কেন? সকালে এতবার ফোন করেছ যে! কী হয়েছে তোমার? প্লিজ বল আমাকে......’
‘আচ্ছা আচ্ছা, এত প্রশ্ন একসাথে জিজ্ঞেস করলে হবে? আমি এসে গেছি প্রায়। এসে বলছি তোমাকে সব।’
ঐ তো অর্নব! আসছে ও। কিন্তু ওকে এমন দেখাচ্ছে কেন! এত গম্ভীর! এমন চেহারায় তো কখনও দেখেনি ওকে তিয়াশা।
প্রায় বছর খানেক হতে চলেছে দু’জন দু’জনকে চেনে ওরা। ভালোবাসে। পরস্পরকে বোঝার চেষ্টা করে। ওদের মধ্যকার সম্পর্কটা চমৎকার! অর্নবের সবচেয়ে ভালো দিক হলো, ও কখনও রাগ করতে পারেনা। গম্ভীর হয়ে বা মন খারাপ করেও থাকতে দেখা যায়না ওকে খুব একটা। সবসময় মুখে এক টুকরো হাসি লেগেই থাকে। আর ওর এই হাসিমুখ দেখলে তিয়াশার ভেতরে সবকিছু ওলটপালট হয়ে যেতে থাকে। গলা শুকিয়ে যায়, হাত-পা কাঁপতে থাকে!
এসব অনুভূতি ছিল সুন্দরকে ভালোবাসার। পাশে পাওয়ার। আনন্দের।
কিন্তু আজ অর্নবের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়েও তিয়াশার গলা শুকিয়ে আসছে। হাত-পা কাঁপছে। এই অনুভূতি তো কোন আনন্দের অনুভূতি নয়। বরং মনে হচ্ছে ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
‘তিয়াশা, তোমাকে এভাবে ডেকেছি খুব প্রয়োজনীয় কিছু কথা বলব বলে।’
‘কিন্তু অর্নব তুমি...তোমাকে এমন...’
‘অস্থির হবেনা। আমি বলছি সব। তুমি একটু ধৈর্য ধরে আমার কথাগুলো শুনবে। আমার কথা শেষ হওয়ার আগে কোন কথা বলবেনা প্লিজ।’
‘আচ্ছা, তুমি বল’ -- কোন রকমে বলল তিয়াশা।
‘আসলে আমি খুব সমস্যার মধ্যে আছি। আর তোমাকে আমার জীবনের এসব সমস্যায় আমি জড়াতে চাইনা। তুমি আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দর আর সবচেয়ে ভালো মেয়ে। কিন্তু আমি তোমাকে পাওয়ার ভাগ্য নিয়ে জন্মাইনি। তাই আমাদের সম্পর্কের এখানেই ইতি টানতে হচ্ছে। আমাকে মাফ করে দিও তুমি।’
‘কি...কিন্তু...’
‘বলছি আমি। আমাকে আজ রাতের ট্রেনেই চট্টগ্রাম চলে যেতে হচ্ছে। মা ডেকে পাঠিয়েছে। খুব নাকি জরুরী। আমি কয়েকদিন পর ঢাকায় ফিরব। ফিরেই তোমাকে সবকিছু খুলে বলব। তখন হয়তো তুমি আমাকে মাফ করে দিতে পারবে।’
‘অর্নব...অর্নব তুমি ...তুমি ফান করছ তাইনা?’-- তিয়াশার চোখে অবিশ্বাস!
‘আমি কোন ফান করছিনা তিয়াশা। আর এখন আমাকে যেতে হবে। অনেক কাজ আছে যেগুলো বাড়িতে যাওয়ার আগেই সেরে ফেলতে হবে।’-- বলেই আর দাঁড়াল না অর্নব। পেছনে ফিরে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা তিয়াশাকেও দেখল না একবার।
কীভাবে যে তিয়াশা বাসায় ফিরেছে ও নিজেও জানেনা। উদ্ভ্রান্তের মতো দৃষ্টি নিয়ে টলতে টলতে কোন রকমে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল সে।
‘কীরে কী হয়েছে তোর? কী হয়েছে বল মা। খারাপ লাগছে?’-- মা এসে আগলে ধরেন তিয়াশাকে।
‘মা, আমার খুব......’ -- এইটুকু বলে মায়ের কোলে ঢলে পড়ল তিয়াশা।
জ্ঞান ফিরলে নিজেকে ওর ঘরে আবিষ্কার করল তিয়াশা। পাশে উদ্বিগ্ন মুখে মা বসে আছেন।
‘মা, আমি খুব ...আসলে...’
‘এখন কিছু বলতে হবে না মা। ডাক্তার বলে গেছে তোকে রেস্ট নিতে। কোন স্ট্রেস নিস না। একটু কিছু খেয়ে ঘুমানোর চেষ্টা কর।’
‘মা, বাবাকে কিছু বোলনা প্লিজ।’
‘আমাকে বলতে হবে কেন? তোকে দেখলেই তো তোর বাবা বুঝে যাবে যে তার কন্যা ঠিক নেই।’ মা নিজের হাতে ওকে খাইয়ে দিলেন। তারপর ঔষধ খাইয়ে দিয়ে ঘুমাতে বলে গেলেন তিয়াশাকে।
মা চলে গেলে দুর্বল পায়ে উঠে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াল তিয়াশা। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি। একটা বুলবুলি পাখি বৃষ্টির পানিতে ভিজছে। একা। খুব অসহায় দেখতে লাগছে পাখিটাকে। তিয়াশা ভাবে, বুলবুলির সঙ্গীটা গেল কোথায়! ছোট্ট পাখিটার জন্য কষ্ট হতে থাকে ওর। পাখিটার মধ্যে নিজের ছায়া কী দেখতে পেল সে? একাকীত্বের ছায়া!
বৃষ্টি খুব প্রিয় তিয়াশার। অর্নবকে নিয়ে হাত ধরাধরি করে তুমুল বর্ষা মাথায় করে পথ হাঁটার ইচ্ছে ওর কতদিনের! আর কোনদিন পূরণ হবেনা সে ইচ্ছে। হঠাৎ করেই বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাও যেন চলে যেতে থাকে তিয়াশার। ঠিকমত শ্বাস নিতে পারেনা ও। অবশেষে শ্রাবণধারার জোয়ার এল ওর দু’চোখ বেয়ে। এই প্রথম ও কাঁদতে পারল।
সারাদিন আর কিছু খেতে পারলনা তিয়াশা। ঘুমাতেও পারলনা ঠিকমত। একটা আধো ঘুম আধো জাগরণের দুঃস্বপ্নময় জগতে আটকে রইল। মাঝখানে একবার বাবা-মা এসে দেখে গেছেন যে ও ঘুমুচ্ছে। আসলে কী ঘুমাতে পেরেছিল তিয়াশা?
না, ঘুমাতে পারেনি। অনেকবার অর্নবের বন্ধ করে রাখা ফোনে ফোন করেছে তিয়াশা। বার বার আশাহত হয়েছে আর গলার মাঝে দলা পাকিয়ে আটকে থাকা কান্নাগুলোকে ঝরিয়েছে, কখনও নীরবে, কখনওবা সশব্দে।
এত কষ্ট কেন দিল তাকে অর্নব! তাহলে কী কখনই তিয়াশাকে ভালোবাসেনি সে! সব অভিনয় ছিল? সব মিথ্যে? এত মধুর স্মৃতি দু’জনের, কিভাবে ভুলে যাবে তিয়াশা!
এতকিছুর পরও অর্নবের উপর রাগ হয়না ওর। হয়ত ভালোবাসার মানুষের উপর কখনই রাগ করা যায়না। শুধু অভিমান করা যায়। আর ভালোবাসার মানুষটি সামনে এসে ভালোবাসাময় হাসিমুখটি দেখালেই এ অভিমান কর্পুরের মত কোথায় উড়ে যায়!
‘অর্নব, তুমি ফিরে এস।’ -- প্রার্থনামগ্ন তিয়াশা।
‘তিয়াশা মা, আসব?’-- বাবার কণ্ঠ। এত রাতে!
‘এসো বাবা।’
‘আমি খোঁজ নিয়েই এসেছি যে তুমি জেগে আছ’-- বাবা ভেতরে এলে তিয়াশা দেখল বাবার হাতে একটি বিশাল কেক।
‘Happy Birthday to my Princess! My little Princess is now a beautiful young lady of 23’
‘Happy Birthday মা, এখন একটু ভালো লাগছে তোর?’-- বাবার পেছনে মা’ও এসেছেন। তার হাতে প্রতিবারের মতো একটা সারপ্রাইজ গিফট।
‘এখন কেক কাটা হবে। ঝটপট তেইশটা মোমবাতি জ্বালিয়ে ফেলি।’-- বাবা বললেন।
তিয়াশা দেখল রাত বারোটা বেজে দুই মিনিট।
কেক কাটা হলে, সারপ্রাইজ গিফটটা তিয়াশার ঘরে রেখে বাবা-মা চলে গেলেন।
এখন একটু ভালো লাগছে তিয়াশার।
বাবা-মা ছিলেন বলেই আজও পৃথিবীটাকে সুন্দর মনে হয়। জন্মের পর থেকেই পরম যত্নে সব প্রতিকূল পরিবেশ থেকে ওকে আগলে রেখেছেন এই দুইজন মানুষ। এখনও তারা তাদের সাধ্যমত চেষ্টা করে চলেছেন তাদের সন্তানকে ভালো রাখার। বাবা-মা’র প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে ওঠে তিয়াশার।
জন্মদিনে প্রতিবার রাত বারোটার পর কেক কাটা আর একটা সারপ্রাইজ গিফটের জন্য কি অপেক্ষাই না করে তিয়াশা। আর এইবার মনেই ছিলনা জন্মদিনের কথা। সারপ্রাইজ পেতে খুব ভালো লাগে ওর। তাই প্রতিবারই বাবা-মা ওকে একটা দারুণ কিছু উপহার দেন। অন্য সময় হলে বাবা-মা চলে যাওয়ার সাথে সাথেই গিফটটা খুলতে শুরু করত তিয়াশা। কিন্তু এইবার ওটা পড়ে রইল একই জায়গায়। নিঃসন্দেহে এটা ওর জীবনের সবচেয়ে জঘন্য জন্মদিন।
‘আমার মাঝে মাঝেই মনে হত, আমার জন্মদিনই হবে আমার মৃত্যুদিন। তুমি কী আমার এই ধারণাকেই সত্যি করতে চেয়েছ অর্নব!’-- ভাবনার জগতে হারিয়ে যায় তিয়াশা।
ঘুম এসেছিল তাহলে। খুব সকালে ঘুম ভাঙল তিয়াশার। উঠেই জানালার পাশে চলে গেল বিষাদময় সকালটাকে দেখতে। মেঘলা আকাশ। তবে বৃষ্টি নেই। দু’টো বুলবুলি কিচিরমিচির করছে! আরে বুলবুলিটা ওর সঙ্গীকে খুঁজে পেয়েছে তাহলে!
আচ্ছা, অর্নবকে একটা ফোন করবে নাকি, ভাবল তিয়াশা। হয়ত আজ ওর জন্মদিন বলে একটু ভালো ব্যবহার করবে ওর সাথে। আর তাছাড়া ঠিকমতো বাড়িতে পৌঁছাল কিনা তাও তো জানা হয়নি তিয়াশার। হ্যাঁ, একটা ফোন করেই দেখা যাক।
‘দুঃখিত এই মুহূর্তে.........’-- ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় তিয়াশার। মোবাইলটাকে অফ করে একপাশে ছুঁড়ে ফেলে ও। চিৎকার করে কাঁদে তিয়াশা।
সকাল সাতটায় মা এলেন ব্রেকফাস্ট নিয়ে। বাবাও মাঝে একবার এসে দেখা করে গেছেন তিয়াশার সাথে ।
‘বাইরে কোথাও প্রোগ্রাম নেই আজ তোর? বন্ধুদের সাথে?’ -- মা জিজ্ঞাসা করেন।
‘না মা, কোন প্ল্যান করা হয়নি। আর তাছাড়া আমার ভালোও লাগছেনা।’
‘ভালো লাগছেনা বললে হবে? বাইরে কোথাও থেকে ঘুরে এলে, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিলে তো ভালোই লাগার কথা তোর।’
‘মা একটা রিকোয়েস্ট রাখবে আমার?’
‘কী রিকোয়েস্ট বল, রাখব।’
‘আজ বাসায় কোন গেস্ট ইনভাইট করবে না প্লিজ। আমার একদম ভালো লাগছেনা।’
‘আচ্ছা। কথা যখন দিয়েছি, তা তো রাখতেই হবে।’
‘থ্যাংকিউ মা!’
‘কিন্তু বাইরে কোথাও তোর প্রোগ্রাম না থাকলে বলিস আমাকে। আমরা তিনজনেই না হয় কোথাও থেকে ঘুরে অথবা বাইরে কোথাও থেকে খেয়ে আসব।’
‘আচ্ছা মা, বলব তোমাকে।’
‘তিয়াশা-আম্মা ! তুমার মোবাইল নাকি বন্ধ, তাই তুমার বান্ধবী জুলেখা তুমারে বাসার ফুনে ফুন দিসে। লাইনে আছে।’ -- এই হলো ফুলি খালা। তিয়াশাদের বাসায় আছে অনেকদিন। বাসার সব কাজ পারলে ফুলি খালাই করে। ছোটোবেলা থেকেই দেখে আসছে তিয়াশা।
‘আমার তো জুলেখা নামে কোন বন্ধু নেই ফুলি খালা। নিশ্চয়ই রং নাম্বার হবে।’
‘না গো আম্মা। আমার কথা বিশ্বাস যাও। তুমারেই খোঁজতেছে।’
‘হ্যালো তিয়াশা!! হ্যাপ্পি বার্থডে টু ইউ!! তোর মোবাইল অফ কেন? কী হইছে তোর?’
‘হ্যালো, কে রে তুই?’
‘বলিস কি! আমাকে চিনতে পারতেছিস না! তোর তো আসলেই মাথা গেছে! ফুলি খালা আমার নাম বলে নাই তোকে? আমি জুলিয়া!’
‘ওহ তাই বল। থ্যাংকিউ দোস্ত। ফুলি খালা বলছিল যে কোন জুলেখা নাকি ফোন করেছে, তাই চিনতে পারি নাই তোরে।’
‘হিহিহি জুলেখা...ফুলি খালা... হিহি...জুলিয়া থেকে জুলেখা বানায় দিল! আচ্ছা তোর কি হইছে বল!’
‘আমার কিছু হয় নাই রে। এই এমনি একটু মাইগ্রেন...’
‘আরে এসব বাদ দে এখন। বাইরে আয়। আমরা সবাই আছি। বিশাল আড্ডা দিব। অনেক মজা করব। তোর মাথাব্যথা সব পালাবে।’
‘শোন আমি আসলে...’
‘কোন শোনাশুনি নাই। আগে আয় তারপর বলবি। সবাইরে বলছি সকাল দশটার সময় ন্যাশনাল মিউজিয়ামের গেটে থাকতে। ঐখানে সবাই মিট করে ঠিক করব কোথায় কোথায় আমরা যাব আজকে।
ক্লিয়ার? সুতরাং সকাল দশটায় উপস্থিত হবি। টাটা ।’
তিয়াশা একবার ভাবল যে যাবে না বাইরে। আবার ওর মনে হল, যদি বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে কিছুক্ষণ কষ্ট ভুলে থাকা যায় তো মন্দ কী! তাই সকাল পৌনে দশটায় বাসা থেকে বের হল তিয়াশা।
এলিফ্যান্ট রোড থেকে শাহবাগ দূরে নয়, ওর মনে হল ও পৌঁছে যাবে সবার আগে। আর দাঁড়িয়ে থাকবে একা একা, যে কাজটা ওর সবচেয়ে অসহ্য!
হলোও তাই। কেউ আসেনি এখনও। জুলিয়াকে কল দিল তিয়াশা। রিং হচ্ছে। কিন্তু রিসিভ করছেনা কেউ। এই এক সমস্যা! কাজের সময় কেউ ফোন রিসিভ করেনা। কে কে আসবে তাও জুলিয়ার কাছ থেকে জেনে নেওয়া হয়নি। তাহলে ওদেরকে ফোন দেওয়া যেত।
আকাশে মেঘ করেছে ভালোই। বৃষ্টি নামবে নাকি! একা একা এরকম জায়গায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভেজার কোনই ইচ্ছে নেই তিয়াশার। জুলিয়াকে আবার ফোন করল সে।
-- ‘হ্যালো তিয়াশা। আমাদের আর দশ মিনিট লাগবে দোস্ত। জ্যামে পড়ছিলাম রে! তুই এক কাজ কর বুঝলি, মিউজিয়ামের অপজিটে যে ফুলের দোকানটা থেকে আমরা ফুল কিনি ঐ দোকানে একটু যা। আমি গতকাল কিছু নীল অর্কিডের অর্ডার দিসিলাম। আজকেই লাগবে। এনেছে কিনা দেখ তো। একা একা দাঁড়ায় না থেকে এইটা কর। ততক্ষণে আমরা চলে আসব। টাটা।’
এতক্ষণ একা দাঁড়িয়ে না থেকে ফুলের দোকানগুলোতে ঢুঁ মারলেই কাজ হত, ভাবল তিয়াশা। অজস্র ফুল, অনেক রং, ফুলের সুঘ্রাণ সব মিলিয়ে একটা পবিত্র অনুভূতি কাজ করে!
কিন্তু নির্দিষ্ট দোকানে গিয়ে দাঁড়াতেই মন আরও খারাপ হয়ে গেল তিয়াশার। অনেকগুলো বিশাল বিশাল লাল গোলাপ! কী সুন্দর রং! কী সুঘ্রাণ! কী পবিত্র! তিয়াশার খুব প্রিয় এই ফুল।
অর্নবকে একদিন হাসতে হাসতে বলেছিল সে, ‘ইস! আমার জন্মদিনে কেউ যদি আমাকে এক ট্রাক লাল গোলাপ দিত! তাহলে তাকেও আমি তার খুব প্রিয় কিছু একটা উপহার দিতাম!’
‘এক ট্রাক না হলেও অনেকগুলো দিতে পারি। চলবে না?’
‘অনেকগুলো! কতগুলো?’
‘এই ধর তোমার যত তম জন্মদিন হবে ততগুলো। তাহলে বয়সটাও গোপন করতে পারবে না! এক ঢিলে দুই আম!’
‘এক ঢিলে দুই আম আবার কী জিনিস!’
‘বুঝলে না? ঢিল দিয়ে নিরীহ পাখিকে মারার কি দরকার? তারচেয়ে আম পাড়লে লাভ আছে।’
‘ধুর! এইটা কিছু হইল? বোরিং জোক! হিহিহি! আচ্ছা তারপর তোমাকে আমি তোমার কোন প্রিয় জিনিসটা দিতে পারি?’
‘সারাজীবন ভালোবেসে যেতে পার। এর চেয়ে সেরা কিছু এই মুহূর্তে মনে আসছেনা!’
‘আপু, কিছু লাগবে?’-- দোকানদারের কথায় ভাবনার জগত থেকে বেরিয়ে আসে তিয়াশা। ওর চোখের কোণে চিকচিক করা পানি শুকায়নি তখনও।
‘হ্যাঁ ইয়ে কতগুলো নীল অর্কিডের অর্ডার দেওয়া ছিল। আজকেই নেওয়ার কথা। এনেছেন ওগুলো?’
‘নীল অর্কিড! নীল অর্কিডের অর্ডার কে দিল? আমি তো দিয়েছিলাম তেইশটা স্পেশাল লাল গোলাপের অর্ডার।’
তিয়াশা কিছুক্ষণের জন্য বধির হয়ে গেল। কোন শব্দ শুনছেনা । শুধু একটু আগে শোনা কণ্ঠস্বরটা কানে বেজে চলেছে।
অর্নব! অর্নব এসেছে!
পেছনে ফিরতে সাহস হয়না তিয়াশার। হয়তো ভুল শুনেছে । হয়তো অন্য কেউ। নিজের অজান্তেই চোখ বন্ধ করে ফেলে তিয়াশা!
‘এই গোলাপগুলোকে তো তোমার পাশে ম্লান লাগছে। চোখ বন্ধ অবস্থায় নিজের ছবি কল্পনা করে নাও তারপর চোখ খুলে এগুলোর দিকে তাকাও। নিজেই প্রমাণ পাবে!’
চোখ খুলে গোলাপ নয় তিয়াশা দেখতে পেল সেই চেনা ভালোবাসাময় হাসিমাখা মুখ! অভিমান হয়ে যাচ্ছে কর্পুর!
‘তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার ভাষা আমার নেই। তবুও বলি, আমাকে মাফ করে দাও প্লিজ। আমি জানি তুমি সারপ্রাইজড হতে ভালোবাসো। তাই চেয়েছিলাম তোমাকে চমকে দিতে। কিন্তু তুমি আমাকেই চমকে দিয়েছ! এই কয়টা গোলাপের বিনিময়ে এত ভালোবাসা তো চাইনি আমি!’
তিয়াশা কিছুই বলতে পারেনা। এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে অর্নবের দিকে। ওর চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু যে কোন সময় বিন্দু হয়ে গড়িয়ে যাবে।
অর্নব বলে চলেছে --
‘আমি কিন্তু তোমার খোঁজ নিয়েছি নিয়মিত। তোমার অবস্থার আপডেট আমাকে জানিয়ে হেল্প করার জন্য স্পেশাল থ্যাংকস টু জুলিয়া এবং ফুলি খালা! কিন্তু বিশ্বাস কর, তোমার চেয়ে কষ্ট আমি কিছু কম পাইনি।
ভালোবাসার মানুষকে কষ্ট দিলে সেই কষ্ট হাজার গুণ হয়ে ফিরে আসে, এটা আমি বুঝেছি।’
অর্নব পরম ভালোবাসায় তিয়াশার কাঁপতে থাকা হাতটা ধরল।
ঠিক এই সময় আকাশ ভেঙে নামল বৃষ্টি।
ভালোবাসাময় এই করুণাধারায় সিক্ত হচ্ছে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন মানব-মানবী। আর তেইশটি লাল গোলাপ।
দূর থেকে দৃশ্যটিকে অতিপ্রাকৃত কোন দৃশ্য বলে মনে হচ্ছে!

Comments
Post a Comment